1. gazia229@gmail.com : admin :
হাতি কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? - BarishalNews24
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

হাতি কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

প্রতিবেদক:
  • প্রকাশকাল: শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৫৭ বার দেখা হয়েছে

সম্পাদকীয় ::
সম্প্রতি চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে কিছুসংখ্যক হাতিকে বিদ্যুতায়িত করে হত্যা করা হয়েছে। গত নভেম্বর মাসেই ৮টি হাতিকে মেরে ফেলা হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদে ফেলে।

এভাবে বৈদ্যুতিক ফাঁদে ফেলে অথবা গুলি করে গত ৩০ বছরে দেশে ১৪৩টি হাতি হত্যা করা হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন হাতি বাঁচাতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন।

গত ২১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘গত এক মাসে সাত থেকে আটটি হাতি মারা গেল। দায়িত্ব আমরা এড়াতে পারি না। হাতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। আমরা সবাই হাতি বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছি।’

একই দিনে চট্টগ্রামে একটি মতবিনিময় সভায় বনমন্ত্রী বলেন, ‘হাতি মারা একটি অন্যায় কাজ। আর বিদ্যুতের লাইন দিয়ে হাতি মারা ডাবল অন্যায়।…হাতি হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের কোনো অবস্থায় ক্ষমা করা যাবে না।’

বনমন্ত্রীর এ স্বীকারোক্তিকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আমাদের দেশে কোনো মন্ত্রী বা পদস্থ আমলা কখনো কোনো অঘটন বা দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করেন না। তারা অন্যের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দেন। এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনমন্ত্রী প্রচলিত নিয়ম তথা অনিয়মের ব্যতিক্রম ঘটালেন। তিনি বলেছেন, হাতি হত্যায় জড়িতদের ক্ষমা করা হবে না। অপরাধীদের কী বিচার হয় এবং হাতি রক্ষায় সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম আমরা। আশা করব হাতি হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে, যাতে এমন অপরাধ আর না ঘটে। হাতিরা যেন বনাঞ্চলে নিরাপদে বসবাস ও চলাফেরা করতে পারে।

হাতি হত্যার দায়ে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩৭টি। অধিকাংশ মামলাতেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে আসামি করা হয়েছে। তবে আসামিদের গ্রেফতার করা বা বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। অতএব, বিশ্বাস করতে হয় কোনো অপরাধীর বিচার হয়নি। বিচারহীনতাই অপরাধ বাড়ায়। এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। নির্বিচারে, বিনাবাধায় নৃশংসভাবে হাতি হত্যার মহোৎসব চলছে। এভাবে চলতে থাকলে হাতি নামক প্রাণী এদেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমার থেকে আরও প্রায় আড়াইশ হাতি বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। আগেই বলেছি, গত ৩০ বছরে ১৪৩টি হাতিকে ইতোমধ্যেই হত্যা করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে ৪৩টি হাতি মারা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি চট্টগ্রামে এবং বাকিগুলো বান্দরবান ও কক্সবাজারে।

হাতির বাসস্থান বনাঞ্চল ধ্বংস করে মানুষ সেখানে ঘরবাড়ি বানিয়েছে। বনে হাতির চলাচলের যে পথ বা করিডোর, সেখানেও মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি বা চাষাবাদ করছে। দীর্ঘকাল ধরে হাতি যে পথে চলাচল করে আসছে, সেটা বন্ধ করে দিলে হাতিরা মানবে কেন?

বনাঞ্চল ও পাহাড়ে হাতির খাবারের উৎস মানুষই ধ্বংস করেছে। খাবারের সন্ধানে হাতিরা তাই সমতলে নেমে আসছে, ফসলের খেতে যাচ্ছে। কিছু ফসল নষ্ট হয়। তাই বলে হাতিকে বৈদ্যুতিক শক্ দিয়ে, গুলি করে মেরে ফেলতে হবে? আসল দোষ তো মানুষের। তারা কেন হাতির আবাসস্থল, বনাঞ্চল, খাবারের উৎস ধ্বংস করেছে, হাতি চলাচলের করিডোর দখল করেছে?

বনাঞ্চল হচ্ছে রাষ্ট্রের সম্পত্তি, সেখানে বন্যপ্রাণী বসবাস করবে, মানুষ নয়। বন্যপ্রাণীও রাষ্ট্রের সম্পদ। বন্যপ্রাণী ধরা বা হত্যা করা আইনত নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ কিছু মানুষ সরকারি মালিকানাধীন বনাঞ্চল দখল ও ধ্বংস করে ঘরবাড়ি করছে। চাষাবাদ করছে। এটা অপরাধ। আবার হাতির মতো মূল্যবান বন্যপ্রাণীও হত্যা করছে। সেটা আরও বড় অপরাধ। কোনো অপরাধেরই বিচার নেই।

লোকালয়ে হাতির কারণে যদি ফসলের ক্ষতি হয়, তাহলে জমির মালিককে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। ফসলখেত রক্ষার জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে, মশাল জ্বালিয়ে, হৈ-হল্লা করে হাতি তাড়ানো যায়। তা না করে ফসলখেতের বেড়ায় বিদ্যুতের তার জড়িয়ে রেখে তাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালিত করা হয় হাতির প্রবেশ ঠেকানোর জন্য। এতে হাতি মারা পড়ে। এভাবে বিদ্যুতের অপব্যবহারও অপরাধ।

বাংলাদেশে হাতিকে ‘মহাবিপন্ন’ (critically endangered) প্রাণী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাণীটি এদেশে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অবাধে হাতি নিধন চলতে থাকলে ‘মহাবিপন্ন’ প্রাণীটির বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।

থাইল্যান্ডে হাতিকে জাতীয় প্রাণীর মর্যাদা দিয়ে হাতি সুরক্ষার সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেদেশেও হাতি একসময় ‘বিপন্ন’ (endangered) প্রাণীর তালিকায় স্থান পেয়েছিল। সেটা গত শতাব্দীর আশির দশকের কথা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৮টি দেশে হাতির বসবাস। একশ বছর আগেও থাইল্যান্ডে হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। এ সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকে। হাতির দাঁত অনেক দামে বিদেশে বিক্রি হতো। এজন্য লোভী শিকারিরা পুরুষ হাতি হত্যা করে দাঁত সংগ্রহ করত। শিশু বা বাচ্চা হাতিদের শিকারিরা ধরে নিয়ে বিক্রি করে দিত। কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় থাইল্যান্ডে হাতি নিধন চলেছে দশকের পর দশক ধরে। খাবারের সন্ধানে বন্যহাতিরা কৃষকের ধানখেতেও চলে আসত, ফসল নষ্ট হতো। ফসল বাঁচানোর জন্য সেদেশের কৃষকরাও খেতের চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালিত করে রাখত। এতে বহু হাতি মারা গেছে। অব্যাহতভাবে হাতি নিধন চলতে থাকায় থাইল্যান্ডে বন্যহাতির সংখ্যা কমতে কমতে সত্তরের দশকে দুই হাজারে এসে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় রাজা ভূমিবল হাতি রক্ষার উদ্যোগ নেন। হাতি হত্যা বন্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। হাতির দাঁত সংগ্রহ, বেচাকেনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে পাহাড়ি প্রদেশ চিয়াংমাইতে রাজার নিজস্ব মালিকানায় অনেক জমি রয়েছে। সেই জমি হাতির খামার স্থাপনের জন্য বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া হয়। ফলে বহু হাতির খামার গড়ে উঠেছে চিয়াংমাই প্রদেশে। সেখানে হাতির বসবাস ও পরিচর্যার জন্য সব ব্যবস্থা করা হয়েছে সরকারি তত্ত্বাবধানে। অসুস্থ হাতির চিকিৎসার জন্য হাসপাতালও রয়েছে ওই এলাকায়।

১৯৯৮ সালে আমার চিয়াংমাই যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে সময় মায়েশা এলিফ্যান্ট ক্যাম্প নামে একটি হাতির খামার দেখেছি। সেখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে হাতিরা বসবাস করছে। হাতির খাবারের জন্য খামারের আশপাশের জমিতে বিশেষ এক জাতের ঘাস ও কলাগাছের চাষ করা হয়। এ দিয়েই হাতির খাবারের চাহিদা মেটানো যায়। খামারের মালিক জানালেন, তিনি মাত্র কয়েকটি হাতি নিয়ে খামার স্থাপন করেছিলেন ২০ বছর আগে। প্রজননের মাধ্যমে হাতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১০০তে দাঁড়িয়েছে। হাতিগুলোকে বিভিন্ন ধরনের খেলা শেখানো হয়। হাতি ও হাতির খেলা দেখতে বিপুলসংখ্যক পর্যটক খামারগুলোতে যান। থাইল্যান্ডে পর্যটন খাতের প্রসারে হাতিও এখন বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

থাইল্যান্ডের কৃষকরা এখন ফসল রক্ষার জন্য খেতের চারপাশে বিদ্যুতায়িত তার লাগায় না। ফসলের খেত রক্ষার জন্য শক্ত ও মোটা বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়। সরকারি সহায়তায় কৃষকরা ফসল খেতের সীমানায় শক্ত ও মোটা জাতের বাঁশের ঝাড় তৈরি করেছে। এই বাঁশের ঝাড় অতিক্রম করে বন্যহাতি ফসলের খেতে আসতে পারে না, ফসল রক্ষা পায়, হাতি হত্যাও হয় না। এ ব্যবস্থার কারণে থাইল্যান্ডে হাতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন চার হাজারে দাঁড়িয়েছে। সেদেশে হাতি আর বিপন্ন প্রাণী নয়। যথাযথ ব্যবস্থা ও আন্তরিক উদ্যোগের কারণে থাইল্যান্ডে হাতির সংখ্যা বাড়ছে। আর আমরা কী করছি? হাতি রক্ষায় আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থা যেটুকু রয়েছে, সেটাও প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তাহলে কি ‘মহাবিপন্ন’ হাতি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

অনেকেই জানেন না, বাংলাদেশের বনাঞ্চলে একসময় গন্ডার ছিল। ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের বনভূমি ও সুন্দরবনে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক গন্ডার বিচরণ করত। কিন্তু তারা টিকতে পারেনি, বিলুপ্ত হয়ে গেছে মূলত শিকারিদের কারণে। সুন্দরবনে গন্ডারদের বসবাসে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু শিকারিরা একের পর এক গন্ডার হত্যা করেছে ওদের দামি চামড়া ও শিং সংগ্রহের জন্য। সুন্দরবনের শেষ গন্ডারটিকে হত্যা করা হয় ১৯০৮ সালে। এক প্রভাবশালী জমিদার নিজে গুলি করে হত্যা করেন গন্ডারটিকে।

হাতিকে এদেশে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করতে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা ও আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রচলিত আইনকে প্রয়োজনে আরও কঠোর করতে হবে। ফসলখেতের বেড়ায় বিদ্যুতের তার লাগানো এবং তাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন যাতে না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে, দরকার হলে শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে। হাতির কারণে ফসলহানির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ যত শিগ্গির সম্ভব পরিশোধ করা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বন বিভাগের জনবল কম বলে অভিযোগ করা হয়। পর্যাপ্তসংখ্যক জনবল সেখানে দিতে হবে, যাতে এ অভিযোগ না থাকে।

বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকাও জরুরি। সব মহলের আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই হাতিকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© 2021 - All rights Reserved - BarishalNews24
Bengali Bengali English English