1. gazia229@gmail.com : admin :
যন্ত্রনাদায়ক অন্ধকার কারাগার - শেষ পর্ব - BarishalNews24
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন

যন্ত্রনাদায়ক অন্ধকার কারাগার – শেষ পর্ব

প্রতিবেদক:
  • প্রকাশকাল: শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০২২
  • ১৮৫ বার দেখা হয়েছে

পুরো লেখাটি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছি। লেখার মাঝে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারি নি।
লেখায় ভুল থাকলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আজ কারাগারের ৩বছর । আজকের এই দিনে
রোষানলে পরে কারাগারের পথে হেটেছি।
আল আমিন গাজী একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী

 

ছোট বেলা থেকেই আমি একটু চঞ্চল প্রকৃতির লোক ছিলাম। কোন ঘটনা শুনলেই সেই ঘটনার পিছনে থাকা ঘটনাকে খুঁজেবের করার জন্য অনুসন্ধান করতাম। আমি সাংবাদিকতা পেশায় মাত্র সাড়ে ৯বছর যাবৎ কর্মরত আছি। বরিশালের বিভিন্ন স্থানীয় পত্রিকা সহ ঢাকার জাতীয় দৈনিক ও একাধীক অনলাইন পত্রিকায় কর্মরত ছিলাম।

চলার পথে বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিলাম। তবে চলার পথে ২/১জন সাংবাদিক এর সাথে সম্পর্ক গড়তে পারি নাই। যাই হোক গত বছরের আজকের এই দিনে আমি যে পত্রিকা কাজ করি সেই পত্রিকার বিরুদ্ধে বরিশাল বিজ্ঞ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি।

সেই মামলায় কে কে আসামি ছিলো তা ও আমার জানা ছিলো না। হঠাৎ একদিন বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার পুলিশের ৪ কর্মকর্তা আমার অফিসের ভিতর প্রবেশ করে। আমি তখন বরিশাল নগরী সম্পর্কে একটি সংবাদ লিখতে ছিলাম। তাদেকে দেখে বললাম বসেন চা খান। তখন তারা বলেন, আপনার সম্পাদক এম. লোকমান হোসাঈন কোথায়। আমি তাদের উওরে বলেছি সে ১০ মিনিট আগে বের হয়েছে। তাদেকে চা খেতে দিলাম। চা খেয়ে তারা সবাই চলে গেলেন।

কিন্তু ২০মিনিট পর আবার অফিসের ভিতরে প্রবেশ করলেন, আমি তাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা আবার আসলেন, উত্তরে বললেন আপনাকে আটক করতে এসেছি । আমি জিজ্ঞাসা করলাম আমার অপরাধ কি? তারা প্রশ্নের উত্তরে বলেন,আপনি একটি মানববন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন তাই আপনাকে আটক করা হয়েছে।


২০১৯ সালের ২০শে মার্চ সময়ের বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত

আমি তাদের কথা শুনে বলি আমি তো জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাইদুল ইসলামের করা মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধনের আবেদন করেছি। এখানে আমার অপরাধ কি? পুলিশ কোন কথা না বলেই আমাকে তাদের সাথে যেতে বলেন। তখন তাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে কোন ওয়ারেন্ট ছিলো না। আমি তখন হতভম্ব হয়ে বলি চলেন, তবে আমি কোন অপরাধ করি নাই। আমি তো চাকরি করি বেতন ভূক্ত কর্মচারী। যে ঝামেলা চলছে তা পত্রিকার কর্তৃপক্ষ সাথে। আমার সাথে কেন এরকম হবে। তারপর ও তাদের কথায় সম্মান দেখিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। কারন আমি আইনকে কখনই অসম্মান করি নাই। তখন তাদের মধ্যে একজন একটি হাতকড়া বের করে আমার হাতে পড়ায় । আমি তখন তাদের বলি আমাকে হাতকড়া পড়ানোর দরকার নেই। কিন্তু তারা আমার কথা না শুনে হাতকড়া পরিয়ে অফিসের ৫ম তলা থেকে নামিয়ে টানাহেছড়া করে নিয়ে যায়। আমি সেই মূর্হুতে আমার সিনিয়র একাধিক সাংবাদিক ভাইদেরকে ফোন করে বিষয়টি জানাই।

কিন্তু আমি তখন বুঝতে পারি নাই যে আমি কিন্তু সাংবাদিক নেতা ও তাদের সহযোগীদের রোষানলে পড়ে গিয়েছি। তারপর ও পুলিশ আমাকে থানায় নিয়ে গেল। থানায় গিয়ে জানতে পারি, থানায় আমাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নাই। মামলা ছাড়াই আটক করেছে। তখন আমার সিনিয়র সাংবাদিকরা খবর পেয়ে থানায় হাজির হয়েছেন। আমার মনের ভিতর তীব্র যন্ত্রণা ও অজানা আশঙ্কায় খুড়ে খুড়ে খাচ্ছে। সবাই চেষ্টা চালিয়েছে আমাকে ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার কপাল খারাপ। বাসায় খবর পেল আমি আটক হয়েছি। মা বাবা আসলো থানায় মা কান্না করছে থানার বারান্দায়। আমিও কান্নায় ভেঙ্গে পরছিলাম । কারন কোন অপরাধ না করেই দোষী হলাম। যাই হোক তখন ভাবলাম হয়তো সবার চেষ্টায় আমাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তা আর হলো না। রাতে সবাই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছে। রাতে আমাকে থানার গারদখানায় নেয়া হয়। গারদে ৪/৫জন আসামি ছিলো বিভিন্ন মামলার। সবাই একটি চটের উপরে দলামোচ করে ঘুমিয়ে আছে। আমি তখন মাথা নিচু করে বসে আছি । কান্না করতে ছিলাম । কারন আমার পরিবারে সবাই আমার উপর নির্ভশীল। রাতে থানার বিভিন্ন কর্মকর্তা গারদে আমাকে দেখতে আসে। আমি তখন আসামিদের কাতারে বসে আছি। মা-বাবা থানার বাহিরে বসে চিৎকার করে কান্না করতে ছিলো । আমি মায়ের কান্না শব্দ শুনতে পাই। গারদে মশা বিভিন্ন পোকায় ভরা। বাথরুমের গন্ধ । সব মিলিয়ে এক অজানা যন্ত্রনা অনুভাব করতে ছিলাম। রাত তখন সাড়ে ৩টা। গারদে বাকি আসামীরা শুয়ে আছে। তখন অনেক শীত। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি তবে এ রকম যন্ত্রণা দায়ক কষ্ট করি নাই। গারদে বাকি আসামী একটি কম্বল শরীরে জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি শীতের ভিতর বসে আমার পরিবারে কথা চিন্তা করতে ছিলাম। আমাকে ছাড়া তারা কিভাবে চলবে। গারদে একদিকে মশার কামড়, অন্য দিকে ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিলাম ।


ছবির ক্যাপশন: ১মাস ২৭ দিন পর উচ্চআদালত থেকে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হওয়ায় আমার সহকর্মীরা ফুলেল মালা দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

তখন রাত ৪টা ১৫মিনিট। চোখেও ঘুম হানা দিচ্ছে। বসে থাকতে থাকতে সকাল হয়ে গেল। থানায় আমার সহকর্মীরা একে একে জড়ো হতে লাগলো। হঠাৎ থানায় এক পুলিশ সদস্য গারদ খুলে আমাকে বের করলো তখন মনে হয়েছিলো আমি এখান থেকে মুক্ত। কিন্তু না আমার ধারণা ভুল। আমাকে আবার হাতকড়া পড়িয়ে থানা থেকে বের করে আদালতে নিয়ে গেল। পরে জানতে পারলাম, রাতে না সকালে থানায় মামলা হইছে। তবে কোর্টের গারদখানার অবস্থা একই রকম। তবে সেখানে প্রায় একটি রুমে ১৫/২০জন আসামি। কেউ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইয়াবা ব্যবসায়ী, চোরসহ বিভিন্ন মামলার আসামী।

হঠাৎ একটি ছেলে কোর্টগারদে ভিতরে বসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো ভাই আপনি তো সাংবাদিক আল আমিন গাজী। আমি লজ্জায় মুখে কথা না বলে মাথাটা নিচু করে দিলাম। সেই লোকটি সহ বেশ কিছু ছেলেরা কথাটা শুনে কাছে চলে আসলো। এরপর নানা প্রশ্ন? আমি কি মামলায় আটক হলাম। তাদের প্রশ্নের উওর দিতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কোর্টগারদের দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা আমার পরিচিত । তারা আসামীদের প্রশ্ন গুলো শুনে তাদের বলে আল আমিন গাজী বিজ্ঞ আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারে জড়িত আছে। আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি ওই পুলিশ কর্মকর্তার দিকে। কারন প্রশাসন আমাকে কোন মামলার অজুহাত দেখিয়ে আটক করে তা তখনও আমি পরিস্কার ভাবে জানতে পারি নাই। তখন সময় প্রায় দুপুর সাড়ে ১২টা। কোর্টগারদে আমাকে দেখতে আমার পরিচিত বিভিন্ন পেশার মানুষ আসছে। আমাকে যখন কোর্ট গারদ খুলে আবার হাতে হাতকড়া পড়িয়েছে। তখন মনটা চমকে উঠলো। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। কারন থানায় আমার নামে কখনই কোন মামলা বা অভিযোগ ছিলো না। গারদের এক পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে হঠাৎ বলে উঠলো আল আমিন গাজী ছোট ভাই তুমি যে মামলায় আসামি তোমার এই মামলায় ১ বছরেও জামিন হবে না। কারন মামলাটা বিজ্ঞ আদালত পরিচালনায় থাকবে। এর মধ্যেই এক পুলিশ সদস্য নাম ধরে ডাক দিলো। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। সে বলে উঠলো চলেন যেতে হবে। আমি বললাম কোথায়। সে বলে জেলখানায়। আমি কোর্টগারদ থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলাম। তখন মা-বাবা ও পরিবারের সবাই কান্না করতে ছিলো । আমি আর তাদের কান্না সইতে পারি নাই।

এমন একটা পরিস্থিতির কোন দিন মোকাবেলা করতে হবে তা ভাবতে পারি নাই। আমার মা অসুস্থ নানা রোগে জড়জড়িত। মা -বাবাকে ছেড়ে কোন দিন পুলিশের জেল কাভারভ্যানে যেতে হবে তা কখনই কল্পনা করি নাই। হঠাৎ গাড়ি ছেড়ে দিলো। কিন্তু মায়ের মনতো, কোনদিন দূরে যেতে দেয়নি। আর মা বুকে কষ্ট নিয়ে ওই গাড়ির পিছনে দৌড়াতে লাগলো। অতঃপর,

(পর্ব২) আসামীদের বহন করা ক্যাভার ভ্যানটি যখন বিবি পুকুরপাড় সড়ক থেকে যাচ্ছিল তখন পত্রিকা অফিসের কথা মনে পড়ে গেল। কারণ গত ১৯মার্চ রাতে সদর রোড হাবিব ভবনের ৫ম তলা দৈনিক আজকের সময়ের বার্তা অফিস থেকে আমাকে পুলিশ আটক করেছিলো। ক্যাভার ভ্যানটি চলছে প্রায় কারাগারের কাছাকাছি চলে আসছে। মনের ভিতর তখন ভয় কাজ করছে আর নানা প্রশ্ন মনে ভিতর হানা দিচ্ছে। কারণ জীবনের প্রথম কোথাও একা যাচ্ছি। মুক্তি মিলবে কবে তা ও কোন নিদিষ্ট দিন বা সময় নেই। আগে একটু বলে রাখি ,সাংবাদিকতা করার ফাঁকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার এর জেলার ইউনুস জামানের সাথে একটি সু-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। ভাবছি তার সামনে সাংবাদিক হিসাবে গিয়ে কথা ও বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করতাম। আর আজ তার সামনে আসামি হিসাবে গিয়ে দাড়াতে হবে।

হঠাৎ ক্যাভার ভ্যানটি থেমে গেল তখন বুঝতে পারলাম আমি কারাগারে পৌছে গেছি। গাড়ি থেকে এক এক করে আসামিদের নামতে বলা হলো, আমি ও সবার মত হাতকড়া পড়া অবস্থায় গাড়ি থেকে নেমে কারাগারের প্রথম গেটের ভিতর ঠুকলাম। সবাইকে বসতে বলা হলো। কারন এক এক করে সব আসামীদের শরীর থেকে নগদ টাকা, মাদক, ফায়ার বক্স, হাতের আন্টিসহ যাবতীয় ইত্যাদি জিনিস সাথে আছে কি না তা চেক করবে কারাগারের সদস্যরা। সবার মত আমাকে ও চেক করা হলো। হঠাৎ এক পরিচিত কারাসদস্য ও জেলার সাহেব তার রুম থেকে বের হলো। আমিও তাদের দেখে মাথা নতকরে বসে আছি। কারণ সে যেন আমাকে চিনতে না পারে। এর আগে আমার সহকর্মীরা আটকের দিন রাতেই জেলার সাহেবকে জানিয়ে দিয়েছে যে আমি আটক হয়েছি। জেলার সাহেব বের হয়ে সব আসামীদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন আমি বসে আছি।

তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলেন । আমি অল্প সময় নিয়ে তাকে আটকের বিষয়টি খুলে বললাম তিনি শুনে দুঃখ প্রকাশ করলেন, জেলার সাহেব চলে গেলেন। আমাকেসহ সব আসামীদের কারাগারের সর্বশেষ গেট খুলে ভিতরে নিয়ে গেল। সেখানেও একজন সাজাপাপ্ত আসামি আমাদের শরীর চেক করলো। আমাকে আমদানি নামে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে একজন লোকের জন্য মাত্র ১ হাত জায়গা। এত অল্প জায়গায় কি কেউ থাকতে পারে। মনে মেনে ভাবতে শুরু করলাম এই বুঝি জেলাখানার কষ্ট। আগেই বলে রাখি, আমি মানষিক ভাবে একটু বিপর্যস্ত হয়ে নানা টেনশন আমাকে খুড়ে খুড়ে খাচ্ছে।

তারপর আবার শরীরে জ্বর। এমনিই অনেক ঠান্ডা পরছিলো। হঠাৎ আমি অসুস্থ হয়ে পরি। সাথে সাথে কারা হাসপাতালের ডাক্তার আসলেন, চিকিৎসার জন্য আমাকে কারা হাসপাতালে রাখার সিন্ধান্ত নিলেন । আমাকে কারা হাসপাতালের ৫নং ওয়ার্ডে ২য় তলায় রাখা হলো। সেখানে একটি বেড ও একটি কম্বল দিলো জাকির নামের এক সাজাপাপ্ত আসামি। সেখানে আমার পরিচিত রুপাতলীর সুমন মোল্লাভাই সহ একাধীক ব্যক্তি ছিলেন,কারাগারে আমার প্রথম রাতে একটি ভাজা মাছ,ডাল দিয়ে ভাত দিলো।মাছটা খুবই ছোট,

খেতে একটু কষ্ট হলেও বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া তো লাগবেই। রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম ভোর তখন ৫টা ২জন কারা কর্মকর্তা আসে । সবাইকে উঠতে বলা হলো আমাকেও উঠালো ঘুম থেকে। কিন্তু চোখে অনেক ঘুম । যাক ভিতরের কারা কর্মকর্তাদের বলা হয় ওস্তাদ বা সুবেদার ! আমাদের রুমে কয়জন আসামী আছে গুনে দেখে গেলেন, আর ঘুমাতে পরি নাই। বসে রয়েছি বাকি আসামীদের সাথে। সকাল তখন সময় ৭টা।

প্রতিটি কারাগারে প্রতিটি আসামিদের (কেস ফাইর) এর লাইনে দাড়ানো লাগে । আমাকেও ডাকতে আসলো একজন কয়েদী । কেসফাইলে যেতে হবে গেলাম। সেখানে আমার নাম ,ঠিকানা,পেশা, ও কারাগারে কোন স্থানে আছি সেটা জিজ্ঞাসা করলো আমার একটা ছবিও তুলে রাখলো ।কিছুক্ষণ পর সব আসামীদের কাতারে আমাকেও বসালো। হঠাৎ জেলার সাহেব আসলেন, কারাগারের নিয়ম কানুন গুলো আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। নগদ টাকা, মাদক, মারামারি এসব থেকে দুরে থাকতে বললেন। এর কিছুক্ষন পর আমাকে সকালের নাস্তা দিলো একটি আটা রুটি ও ২৫গ্রাম মিঠা(গুড়)। একটি বড় রুটি এতটুকু গুড় দিয়ে কিভাবে খাবো মনে মনে প্রশ্ন তৈরি হলো। তারপর ও খেলাম কষ্ট করে। জেলার সাহেব চলে গেলেন। আমি ও হাসপাতালে চলে গেলাম। ডাক্তার আসলো প্রাথমিক চিকিৎসা করে আমাকে ওষুধ দিলেন। তখন সময় ১১টা ।

হঠাৎ আমার খোঁজে আমার একজন সাংবাদিক ভাই আসলেন। তাকিয়ে দেখলাম নিয়াজ ভাই। সেও কিছু সাংবাদিকের রোষানলে পড়ে মামলার আসামি । যাক বুকে একটু সাহস পেলাম কারন একজন তো আমার খুব কাছের মানুষ পেলাম।

নিয়াজ ভাইয়ের সাথে সময় কাটালাম। তখন সময় ১২টা । আবার ২ দুইজন কারা কর্মকর্তা ও সদস্য সবাইকে দেখে গুনতে আসছে। গুনে তারা চলে গেলেন। আগেই বলে রাখি কারাগারে ভোর ৫টা, দুপুর ১২টা ও বিকেল ৫টা এই তিন সময় কারা সদস্যরা আসামীদের গুনে খাতায় হিসাব লিখে রাখে। যেন কেউ পালাতে না পারে। এরপর আমিও গোসল করে নামাজের জন্য প্রস্ততি নিলাম। সময় তখন দুুপুর ১টা। হঠাৎ একজন কয়েদী আমাকে সাংবাদিক আল আমিন গাজী বলে উচ্চস্বরে ডাক দিলো । রুম থেকে বের হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলাম সে বললেন আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে অনেক লোকজন। দেখার ঘরে আসুন।

 

আগেই বলে রাখি দেখার ঘরের সময় হলো ৯টা থেকে ১২টা পযর্ন্ত, ২টা থেকে বিকেল ৪টা পযর্ন্ত। দেখার ঘরে প্রবেশ করলাম তিনটি শিক দেয়া রড এর ভিতরে একটি জালি নেটের ভিতর থেকে দেখা করতে হয়। দেখার ঘরে অনেক আসামী ও শিকের ওপারে তাদের স্বজনরা দাড়িয়ে কথা বলছে। আমি ও শিকের কাছে গিয়ে দাড়ালাম। দেখলাম আমার মা, বাবা, সহকর্মী ইমরান ভাই, আমার ১১মাস বয়সী মেয়ে আলিফাসহ পরিবারের সদস্যরা। সবাই কান্না করছে । আমি ও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। মনে হয়েছিলো কত বছর জানি তাদের দেখি নাই । আসলে কারাগার হলো একটা মৃত্যুর কূপ। যেখানে একটি কবর স্থানের মত।

আপন বলতে কেউ থাকে না। যার যার ব্যস্ততা নিজেকেই নিয়ে। আমার একটি বিষয় খুব খারাপ লাগছিলো আমার মেয়েটা ওই কারাগারের শিক ধরে আমার দিক তাকিয়ে ছিলো । সন্তানকে কাছে পেয়েও বুকে জড়ানোর কষ্ট আসলে যে বাবা হয়েছে এতমাত্র তিনিই অনুভব করবে। দেখার ঘরে সময় ১৫ মিনিট । সময় শেষ হলো আমাকে বের হতে হবে । বুকের ভিতর চাপা কষ্ট নিয়ে বের হওয়া আসলে একটি যন্ত্রনা। আমার অসুস্থতার কথা শুনে মা, বাবা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। যাক মনকে সামাল দিয়ে বের হলাম। হাসপতালে চলে গেলাম। হাসপাতালের ২য় তলায় দাড়িয়ে জানালার কাছে গিয়ে বাহিরের গাড়ি ও মানুষের চলাচল দেখছিলাম। মনে প্রশ্ন ছিলো শত শত, কাল কোথায় ছিলাম আজ কোথায় এলাম। কান্না করতে ছিরাম আর ভাবছি কবে মুক্তি মিলবে এ অন্ধকার কারাগার থেকে। দুপুরে খাবারে জন্য আমাকে ডাল ,ভাত ও সবজি দিলেন। খাবারের মান আসলে বাসাবাড়ির মত না। একটু ভিন্ন । খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়লাম, আগেই বলে রাখি কারাগারে বিকেল ৫টারপর কেউ রুমের বাহিরে থাকতে পারে না।

 

ছবির ক্যাপশন: মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সাংবাদিক আল আমিন গাজীর মুক্তির দাবিতে ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন।

৫টায় গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের রুমের গেট আবারো দুইজন কারাসদস্য গুনে বাহির থেকে আটকিয়ে দিয়েছে। এককথায় বলা যায় একটি চিড়িয়াখানার মত। এরপর কারাগারে প্রথম ৭দিন ছিলো জীবনের একটি কষ্টদায়ক দিন। প্রতিদিনই একই ভাবে দিন কেটে গেছে। আমার যখন ৬দিন হলো কারাগারে। হঠাৎ দেখি আমার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর বেলাল কারাগারে। জিজ্ঞাসা করলাম তুই এখানে কেন? ও বলে ভাই আমাকেও বিজ্ঞ আদালতের জজ এর মামলায় আসামী করে অফিস থেকে আটক করছেন। বুঝতে পারলাম সব মিলিয়ে কিছু গোলমাল আছে। আরকেটা কথা বলে রাখি, ১মাস ২৭ দিন জেল জীবনের আমার বেশি ভাগ সময়ই বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা বই সহ ভিন্ন ভিন্ন কিছু বই পড়েছি।

আর কারাগারে প্রতিটি দিনই আমার মা ও সহকর্মী ইমরান ভাই দেখা করতে আসতেন। কারন আমি যেন তাদের দেখে কষ্ট ভুলে যাই। যেদিন মা না আসতো আমারো খুব কষ্ট হতো। আমিও প্রতিদিনই ছটফট করতাম কখন আসবে আমার জামিনের খবর। কখন মুক্তি পাবো এই অন্ধকার কারাগার থেকে। কখন মেয়েটিকে বুকের ভিতর জড়িয়ে রাখবো। আমি প্রতিরাতেই অনেক কান্না করতাম। আল্লাহ আমাকে কোন পরিক্ষায় রাখলো। আসলে কারাগারে না গেলে কেউ হয়তো বুঝবে না এই পৃথিবীতে তার আপন কে। কারাগারে ওই সময়টা সাধারন কয়েদীদের জীবনের সুখ ও দুঃখের কথা গুলো শুনতাম। আসলে ওখানে যারা আটক আছে কেউ সত্যিই হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, জমি দখল করে সাজা খাটছে। আবার কেউ এসব না করেই বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করছে। কারো জীবনী শুনে হাসতাম আবার কারো জীবনী শুনে কান্না করতাম। আসলে আমি ও আমার কাছের সহকর্মী ভাইদের ও দুই একজন সাংবাদিক নেতাদের রোষানলে পড়ে ওই অন্ধকার কারাগারে ১মাস ২৭দিন কারাভোগ করেছিলাম। বুঝতে পারি নাই যে কাছের মানুষ গুলো আমার এতবড় ক্ষতি করবে। কষ্ট হয়েছে অনেক। তবে হয়তো মহান সৃষ্টিকর্তা এর বিচার একদিন করবেন। আসলে বাহিরের জীবন প্রতিটি মানুষেই সুখের হয়। কারাগারে না গেলে পৃথিবীতে মানুষ চেনা বড় দায়। এ লেখার মাঝে অনেক ঘটনা লুকিয়ে রাখলাম……..

ছবির ক্যাপশন: মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সাংবাদিক আল আমিন গাজীর মুক্তির দাবিতে ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© 2021 - All rights Reserved - BarishalNews24
Bengali Bengali English English