ডেস্ক রিপোর্ট ॥ প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর রাতে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় বিআরআইসিএম ভবনে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন সংবাদ সম্মেলন করে। কমিশনপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) এ এল এম ফজলুর রহমান ও সদস্যরা সেখানে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে পিলখানা হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ভারতের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত স্পষ্ট। ভারত চেয়েছিল—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআর দুর্বল হোক, দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হোক। এটি বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ ভারতের কাছে এ ঘটনায় তথ্য চাইতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া।
‘রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা—উভয়ই ছিল’
কমিশন জানায়, এ হত্যাকাণ্ডে শুধু বিপথগামী বিডিআর সদস্যরা নয়—রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা—সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক ব্যর্থতা ও সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য—“এই ঘটনায় দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত যায়।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল আকবরসহ বেশ কিছু ব্যক্তির নাম জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন কমিশনপ্রধান। যদিও বলেছেন—“আইনগতভাবে মামলা হয়নি বলে বিস্তারিত নাম প্রকাশ করা ঠিক নয়।”
সেনাবাহিনী কেন অভিযান চালায়নি?
সেনাবাহিনীর সে সময়কার সাক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে কমিশন বলে, সেনাপ্রধান জেনারেল মইন দাবি করেছেন—সেনা অভিযান চালালে ভারত হস্তক্ষেপ করত। তবে কমিশনের মতে, অপেক্ষা করার এই সিদ্ধান্ত দেশের নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। র্যাব ৩০–৪০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছুই করেনি—যা স্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
৫ সেনা কর্মকর্তাকে ‘গুম’ নয়, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল
এই পাঁচ কর্মকর্তাকে ভারত বা অন্য কোনো পক্ষ গুম করেছে—এমন ধারণা আগে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কমিশন জানায়, তাঁরা গুম হননি; তাঁদের ডিজিএফআই জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কমিশন বলেছে—এই ধরনের জোরালো পদক্ষেপের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
বহু পূর্বপরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক বৈঠকের প্রমাণ
কমিশন জানায়—২০০৭ সাল থেকেই বিডিআরের বিপথগামী সদস্যরা পরিকল্পনা করছিল। তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বহু বৈঠকের তথ্য প্রমাণ হিসেবে পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক বিডিআর সদস্য তোরাব আলীর বাসায় চূড়ান্ত পরিকল্পনার বৈঠক হয়। সেদিন তাপস সরাসরি হত্যার পরিকল্পনায় অনুমোদন দেন।
ঘটনার সময় পিলখানায় “জয় বাংলা” স্লোগান শোনা যায়, যা ঘটনার রাজনৈতিক প্রণোদনা ইঙ্গিত করে—তদন্তে এমন দাবি এসেছে।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং দুর্বল সমন্বয়
এ ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা সম্পর্কে কমিশনপ্রধান বলেন—“পর্বত সমান ব্যর্থতা ছিল।” সেনাবাহিনী, র্যাব, ডিএমপি—কেউ যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের অভাব হত্যাযজ্ঞকে দ্রুত বিস্তৃত হতে দেয়।
৯২১ ভারতীয় প্রবেশ—৬৭ জনের খোঁজ নেই
তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার সময় ৯২১ ভারতীয় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। তাদের মধ্যে ৬৭ জনের বের হওয়ার রেকর্ড নেই। কেউ বিমানযোগে ঢুকে ট্রেনে বের হয়েছে—এমন অসঙ্গতি “বহিঃশক্তির জড়িত থাকার” একটি বড় চিহ্ন।
ভবিষ্যতের জন্য কমিশনের সুপারিশ
এ ঘটনায় বিজিবি পুনর্গঠন, সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয়, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত তদন্তব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, র্যাবের দায়িত্বপালন নীতিমালা সংশোধন, সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—এসব সুপারিশ তুলে ধরেছে কমিশন।
তারা বলেছে—“ভবিষ্যতে কোনো বাহিনীতে এই ধরনের বিভাজন বা ক্ষোভ তৈরি হলে তা শনাক্ত ও সমাধান করার জন্য শক্তিশালী কাউন্সেলিং ও মনিটরিং টিম থাকা জরুরি।”
