ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৫ জুন ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি
  6. কৃষি
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চাকরির খবর
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জাতীয়
  12. ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬
  13. ধর্ম
  14. নারী ও শিশু
  15. ফিচার
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নরসিংদী থেকে রূপগঞ্জ, ঢাকার চারপাশে বাড়ছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদন
জুন ২৫, ২০২৬ ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ডেস্ক রিপোর্ট ॥ রাজধানী ঢাকা ঘিরে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ ভূমিকম্প বলয়। ঘুরেফিরে উৎপত্তিকেন্দ্র রাজধানীর সন্নিহিত অঞ্চল। মাঝে মধ্যেই ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পনে কেঁপে উঠছে দেশ। সম্প্রতি কয়েকটির উৎপত্তিস্থল রাজধানীর খুব কাছাকাছি হওয়ায় নতুন করে উত্কণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ২২ জুন সোমবার রাত রাত ৯টা ২৯ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার যে ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে গোটা দেশ, তার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। আর ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি না হলেও মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে রাজধানীবাসীর ভেতর বড় ধরনের ভীতির জন্ম দিয়েছে। তার আগে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছিল গত বছরের ২১ নভেম্বর। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭। ১৩ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে, ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ঐ ভূমিকম্পটিকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে উৎপত্তি হওয়া এযাবত্কালের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প বলে অভিহিত করেছেন ভূতত্ত্ববিদরা। ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী সেই ভূমিকম্পে ১০ জনের প্রাণহানিসহ অনেক আহত ও বিপুল মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

মাধবদীর ভূমিকম্পের পরদিন ২২ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে তিন দশমিক তিন মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, ঢাকা থেকে সেই কেন্দ্রের দূরত্ব ছিল ২৯ কিলোমিটার। একই দিনে ঢাকার বাড্ডায় তিন দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তি হয় এবং পরে নরসিংদীতে চার দশমিক তিন মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। শেষেরটির কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। এর কয়েক দিন পর ২৭ নভেম্বর নরসিংদীর ঘোড়াশালে তিন দশমিক ছয় মাত্রার একটি ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে। এরপর এক সপ্তাহের মাথায় ৪ ডিসেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে চার দশমিক এক মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, ঢাকা থেকে যার কেন্দ্র ছিল ৩৮ কিলোমিটার দূরে।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, ঢাকার কাছাকাছি একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? এগুলো কি কেবল স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো টেকটোনিক কার্যকলাপের কারণে হতে পারে, আবার কোনো সক্রিয় ফল্টের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। অনেক সময় নতুন ফল্ট সৃষ্টি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান ইউরেশিয়ান ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগ স্থলের মাঝামাঝি। অন্যদিকে আছে বার্মিজ প্লেট। এই তিন প্লেটের সংযোগের কারণে এখানে বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এসব ভূমিকম্প মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ঐতিহাসিকভাবে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলো। তার মতে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ঢাকার কাছাকাছি শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। কারণ ইতিহাসে এসব অঞ্চলে সাতের বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল এবং বগুড়ার শেরপুর এলাকায় সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৮৮৫ সালে। তিনি বলেন, এগুলো ঢাকা থেকে দেড়শো থেকে দু’শো কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আছে। বাকি বড় ভূমিকম্পগুলো ঢাকা থেকে আরো দূরে হয়েছিল। ঢাকার আশপাশে গত দুই বছরে বেশকিছু ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। তবে ঢাকার জন্য কোনো উদ্বেগের বিষয় আছে কি না, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড (পুনরাবৃত্তির সময় বা চক্র) আছে। সাত মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকায় শিগিগরই হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন এটা কবে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ২০ বছরও লেগে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদীতে যেভাবে একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে, হতে পারে এটি বড় কোনো ভূমিকম্পের ইঙ্গিত। কিন্তু যেসব তথ্য-উপাত্ত আছে, তাতে ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদীতে বড় কোনো ভূমিকম্প কখনো হয়নি, জানান অধ্যাপক আনসারী। তাই নরসিংদী বা ঢাকার আশপাশের ভূমিকম্পের হিসেবে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ না, কিন্তু ঐ অতীতের ঐ বড় ভূমিকম্পগুলোর বিচারে ঢাকা খুবই ঝুঁকিতে আছে। বড় কোনো ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকা কতটা নিরাপদ?

কোন এলাকা কতটুকু নিরাপদ তা বুঝতে হলে দুটি দিকে নজর দিতে হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এক. শহরের ভূতাত্ত্বিক গঠন। দুই. শহরের অবকাঠামো। ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ভূতাত্ত্বিক বিষয়টিকে বিবিসি বাংলাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই। বেশির ভাগ অংশ, বিশেষ করে উত্তর দিকের মাটি মধুপুরের লাল মাটি। যেটি বেশ শক্ত। কিন্তু মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পিরিয়ড, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে উত্তর দিকে এবং বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে শহর খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। তখন এই লাল মাটি ‘অকুপাইড’ হয়ে যায়। এরপর শহর বাড়তে শুরু করে পূর্ব-পশ্চিমে। সেখানে নরম পলিমাটি এবং জলাশয় ছিল যা ভরাট করা হয়েছে।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, শুধু যদি ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করা হয়, তাহলে মধুপুরের লাল মাটির একই গড়নের যেসব এলাকা রয়েছে যেমন—রমনা, মগবাজার, নিউ মার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও ইত্যাদি এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু শুধু ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নির্ভর করছে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ, কোনটি নয়—এটা বলা মুশকিল। যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ বলা যাবে না কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিমুক্ত। অধ্যাপক আনসারীর মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, নতুন ঢাকা ও পুরান ঢাকার মধ্যে পার্থক্য একটাই। তা হলো পুরান ঢাকার সরু রাস্তা। রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় দুর্যোগের সময় মানুষকে দ্রুত সরানো কঠিন হতে পারে। তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে পুরোনো কিছু ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। কোনো ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়েনি। তাই কাঠামোর মানই বেশি গুরুত্ব পায়।

ঢাকার বিপদ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’

ঢাকার ভেতরে কোনো ফল্ট লাইন নেই। তবে বাংলাদেশের ফল্ট লাইন বা চ্যুতি রেখার জন্য পাঁচটি জায়গা পরিচিত। বার্মা বা মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী, যাকে বলে প্লেট বাউন্ডারি এক। সেখানে ১৭৬২ সালে আট দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আরেকটা আছে প্লেট বাউন্ডারি দুই। যেটা নরসিংদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে, অতীতে এখানে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এরপরে প্লেট বাউন্ডারি তিন, যেটা সিলেট থেকে ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে, এখানে ১৯১৮ এবং ১৯৬৯ সালে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আর আছে ডাউকি ফল্ট যেখানে ১৮৯৭ সালে আট দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সবশেষ আছে মধুপুর ফল্ট, যেখানে ১৮৮৫ সালে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। গবেষকদের মতে, এগুলোর কিছু জায়গায় ৩৫০ বছর, আবার কিছু জায়গায় ৯০০ বছরের মতো সময় পরে বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তবে এর বাইরেও কিছু ফল্ট লাইন আছে, যেগুলোকে বলে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’। এটি এমন ধরনের ফল্ট যা ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই ভূপৃষ্ঠে কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে এটি দেখা যায় না বা শনাক্ত করা কঠিন হয়। এই ধরনের ফল্ট বিপজ্জনক। বাংলাদেশে দুটো চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট আছে। একটি ময়মনসিংহে, অন্যটি রংপুরে। যেহেতু এই ফল্ট লাইনগুলো শনাক্ত করা কঠিন তাই কোনো সতর্কবার্তাও পাওয়া যায় না। ঢাকার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এই ব্লাইন্ড ফল্টগুলো।

এদিকে ঘন ঘন ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য সজাগ হওয়ার বার্তা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ভূতত্ত্ববিদ ড.সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকার এত কাছে গত কয়েক দশকে বড় ভূমিকম্প হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরে আছে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল; পূর্বে বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল। প্লেটগুলো গতিশীল থাকায় বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। দুটো প্লেটের সংযোগস্থলে এ ভূমিকম্পটি হয়েছে, ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটে। কম্পনের তীব্রতা ছিল বেশ। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শক্তি আটকে ছিল। এটা আনলকিং শুরু হয়েছে। এখন পরবর্তীকালে গ্যাপ দিয়ে আবার ভূমিকম্প হতে পারে। সেক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হচ্ছে মহড়া। ভূমিকম্পের সময় দুয়েক কদমের মধ্যে নিরপদ জায়গায় চলে যাওয়া, প্রশিক্ষণ নেওয়া। দেশের যে অবকাঠামো তা তো পরিবর্তন করা যাবে না। একমাত্র উপায় মহড়া। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকায় ঝুঁকির মাত্রা সবসময় বেশি। ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান,সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়া মতো শক্তি জমা হয়ে আছে। যেকোনো সময় সে শক্তি বের হয়ে আসতে পারে। এই শক্তি একবারে বের হতে পারে, আবার ধাপে ধাপেও বের হতে পারে। এতে সিলেট ও চট্টগ্রাম ছাড়াও সব থেকে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে রাজধানী। তিনি বলেন,ভূমিকম্পে যদি রাজধানীর এক শতাংশ বিল্ডিং ধ্বসে পড়ে তাহলে ৩ লাখ মানুষ হতাহত হবেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থেকে আরো অনেকের মৃত্যু হবে। এ অবস্থায় ভূমিকম্প সহনীয় নিরাপদ অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের।

বড় ভূমিকম্প হলে ছয় লাখ ভবন বেশি ঝুঁকিতে থাকবে:

অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী জানান, রাজধানী ঢাকা শহরে মোট ২১ লাখ ভবন আছে। এর মধ্যে ছয় লাখ ভবন ছয়তলার ওপরে। বাকিগুলো ছয়তলার নিচে। বড় ভূমিকম্প হলে এই ছয় লাখ ভবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকায় যে বিপর্যয় ঘটে যাবে, সেই বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, বিল্ডিংগুলো এখনই চেক করা দরকার। এখানে সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না, রাজউককে দিয়ে সাধারণ মানুষকে জানান দেবে, সব ভবন চেক করে সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে যে বিল্ডিংগুলো বিল্ডিং কোড অনুযায়ী হয়েছে।

গতকালের শুক্রবারের ভূমিকম্পে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ভবনে ফাটল ধরার প্রসঙ্গ ধরে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, এমন ক্ষয়ক্ষতি হবেই। একটি বড় ভবন ধসে পড়লে কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা বোঝাতে গিয়ে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেন অধ্যাপক আনসারী। সেজন্য সরকারকে এখনই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার তাগাদা দেন তিনি। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রায় যে ক্ষতি হয়েছে, ৭ মাত্রার হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যাবে, ভেঙে যাবে ভবন, হতাহত হবে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ভূমিকম্প হলে ২-৩ লাখ মানুষ হতহাত হবে, ঢাকা শহরের ৩৫% ভেঙে পড়ার শঙ্কা আছে, অর্থাত্ এক তৃতীয়াংশ ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। সেরকম বিপর্যয় এড়াতে ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করার ওপর জোর দিয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ দেখে রিপেয়ার করতে হবে, তারপর সার্টিফিকেট দিতে হবে। এক্ষেত্রে তিন ধরনের রং দিয়ে ভবনগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। সবুজ রং দিয়ে বোঝানো হয়, ঐ ভবনে কোনো ঝুঁকি নেই। হলুদ বা কমলা রং দিয়ে বোঝানো হয়, কমবেশি ঝুঁকি আছে, মজবুত করতে হবে, তাতে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হবে। আর লাল রং দিয়ে বোঝানো হয়, এখনই বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে হবে, ভবন মজবুত করতে হবে অথবা ভেঙে ফেলতে হবে। অধ্যাপক আনসারী বলেন, আমেরিকা, ভারত, জাপানে ভূমিকম্পের আগে এ ধরনের ক্যাটাগরি করা হয়েছে। আমরাও এভাবে কালার কোড করে বিল্ডিংগুলোকে ট্যাগ করে, ভবনের গায়ে রং বসিয়ে দিতে পারি প্ল্যাকার্ড দিয়ে।

ছোট ভূমিকম্প বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস নাকি ঝুঁকি হ্রাসের উপায়

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) দূর অনুধাবন ও জিআইএস শাখার পরিচালক (ভূতত্ত্ব) সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়। আবার এনার্জিও রিলিজ করে। এটি হলে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমে। তবে ছোট ছোট ভূমিকম্প যদি মাঝেমধ্যেই হয় তাহলে তা বড় ভূমিকম্পের বার্তা দিচ্ছে বলা যায়। কিন্তু কোনো গবেষণা ছাড়া এটা সুনিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না। এটার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সংগৃহীত ডাটা ও গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু ঝুঁকি স্টাডি করার জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন তা আমাদের দেশে নেই। তবে এটা বলা যায় বাংলাদেশ কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার উপায়

ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্প হলে ক্ষতি নিশ্চিত। এক্ষেত্রে আমরা ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারি। এর মধ্যে অন্যতম ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় ভূকম্পন সহনশীল ভবন তৈরি করা। জনসচেতনতা তৈরি করা, অর্থাত্ ভূমিকম্প হলে করণীয় কী তা তাদের জানানো। সচেতনতার অংশ হিসেবে বেশি পুরাতন হলে ভবন ভেঙে ফেলা যেতে পারে। তার জায়গায় ভূমিকম্প সহনীয় ভবন তৈরি করতে হবে। কিছু ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা যায়। এছাড়া, ভবন নীতিমালা ঠিকঠাক অনুসরণ করতে হবে। এজন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন গবেষণা এবং সার্বক্ষণিক ডাটা।

২০১৬ সালের পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই রাজউকে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, রাজধানী জুড়ে বিভিন্ন এলাকা অপরিকল্পিত বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে, সেসব ভবন একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকার অনেক এলাকায় ভবন তৈরি করার মতো মাটি নেই। পাশাপাশি যারা ভবন তৈরি করছেন, তারা রাজউকের ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত কোড মানছেন না। অনেক এলাকায় রাজউকের অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ আরো ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ‎এদিকে রাজউকের তথ্য মতে ২০১০ সালে প্রথম ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা হয়। পরে ২০১৬ সালে তালিকাটি হালনাগাদ করা হয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৩২১টি। এছাড়া, বিধিবিধান লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবন রয়েছে ৫ হাজার। অতিঝুঁকিপূর্ণ ৩২১টি ভবনের বেশির ভাগই রয়েছে পুরান ঢাকায়। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।

ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে ঢাকার ৫৬ শতাংশ ভবন

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) সর্বশেষ এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে এমন শীর্ষ ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, অপ্রশস্ত সড়ক অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবই এ ঝুঁকি তৈরি করেছে। ঢাকা শহরে যত কংক্রিটের ভবন বিদ্যমান তার ৫৬.২৬ শতাংশ রয়েছে ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকির মধ্যে। মাঝারি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ৩৬.৮৭ শতাংশ ভবন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জিআইএস ডাটাবেজ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৩টি ভবনের তথ্য নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে এইচবিআরআই।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৪৮টি ওয়ার্ডে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা ভবনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ‘খুব উচ্চঝুঁকি’র মধ্যে রয়েছে ১, ৩, ৭, ১২, ১৪, ২২, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৪ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড। আর ‘উচ্চঝুঁকি’র মধ্যে রয়েছে ২, ৫, ১১, ১৩, ১৬, ১৮, ১৯, ২১, ২৩, ২৫, ২৬ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ‘খুব উচ্চঝুঁকি’র মধ্যে রয়েছে ১, ১২, ১৩, ১৬, ১৭, ২৩, ২৫, ২৬, ২৮, ২৯, ৩০ ও ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড। আর ‘উচ্চঝুঁকি’র মধ্যে রয়েছে ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১৫, ১৯, ২৭, ৩৯, ৪৫, ৪৭ ও ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড।

ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকাকে ঘিরে ‘মেগা প্ল্যান’

রাজধানী ঢাকাকে ভূমিকম্প সহনশীল নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরো কার্যকর করতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ১ লাখ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের পাশাপাশি ৪৫০টি ‘অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট’ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদারে ফায়ার সার্ভিস ও আবহাওয়া অধিদপ্তরকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সশস্ত্র বাহিনী, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে থাকা ৫২ থেকে ৫৪ ধরনের ভারী যন্ত্রপাতির তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে থাকা হেলিকপটার এবং হাসপাতালগুলোর শয্যা সক্ষমতার তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘নবম আরবান ডায়ালগ-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আরবান আইএনজিও ফোরাম বাংলাদেশ।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।