ডেস্ক রিপোর্ট ॥ দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি রাডারই অচল হয়ে পড়ায়। সর্বশেষ ঢাকা অঞ্চলের রাডার বিকল হওয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমানে দেশের কোনো আবহাওয়া রাডারই সচল নেই। ফলে ঝড়, বজ্রপাত, অতিভারি বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।
দেশের পাঁচটি রাডার ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় স্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে রংপুরের নতুন ডপলার রাডার ১৭ জুন থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজারের রাডার প্রায় তিন বছর ধরে অচল, মৌলভীবাজারের রাডার কয়েক বছর ধরে বিকল এবং খেপুপাড়ার রাডার ২০১৮ সাল থেকে বন্ধ। সর্বশেষ ৪ জুলাই ঢাকা রাডারও অচল হয়ে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অধিকাংশ রাডারের যন্ত্রাংশ পুরোনো হয়ে গেছে। কিছু যন্ত্রাংশের ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং অনেক প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাজারে আর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমানে দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সতর্কতা দিয়েছে। জুলাই মাসের পূর্বাভাসেও অতিভারি বৃষ্টি, বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাডার সচল না থাকায় তাৎক্ষণিক আবহাওয়া বিশ্লেষণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
রংপুরের রাডারের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৯৯ সালে জাপানের অর্থায়নে স্থাপিত রাডারটি ২০০৭ সালে বড় ধরনের ত্রুটিতে পড়ে এবং ২০১২ সালে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় পর জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ডপলার রাডার স্থাপন করা হয়। জাপানের শিমিজু করপোরেশন এটি নির্মাণ করে এবং মারুবিনি করপোরেশন সরঞ্জাম সরবরাহ করে। গত বছরের ১১ মে রাডারটি আনুষ্ঠানিকভাবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রাডারটি ৪৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম ছিল এবং ঝড়, বজ্রপাত, মেঘের গঠন, বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বায়ুর গতিবেগ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য দিত। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে এটি এখন বন্ধ। রংপুর আবহাওয়া কার্যালয়ের প্রধান মো. মোস্তাফিজার রহমান জানান, জাইকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ওয়ারেন্টির আওতায় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
মৌলভীবাজারের রাডার বন্ধ থাকায় হাওরাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা ও বজ্রঝড় পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। কক্সবাজারের রাডার বন্ধ থাকায় সমুদ্রে যাওয়া জেলেদের জন্য তাৎক্ষণিক আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রাডার সচল না থাকায় স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ঢাকায় পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে খেপুপাড়া রাডার দীর্ঘ আট বছর ধরে অচল থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড় ও বৃষ্টিপাত বিশ্লেষণেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, স্যাটেলাইট চিত্র ও গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও স্বল্পমেয়াদি এবং নির্দিষ্ট এলাকার বজ্রঝড় ও মেঘের গতিপথ নির্ধারণে রাডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে দ্রুত সব রাডার সচল করা জরুরি।
