বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মৃত্যু সময়কে ভাগ করে দেয়—আগের বাংলাদেশ আর পরের বাংলাদেশ। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যু যেমন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছিল, তেমনি ২০২৫ সালে শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যু আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
নূর হোসেন ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। কোনো বড় পদ, ক্ষমতা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তার ছিল না। তবুও তিনি বুক-পিঠে লেখা দুটি বাক্য—‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ও ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’—নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। রাষ্ট্র তখন প্রকাশ্য স্বৈরশাসনের অধীনে ছিল। গুলির মুখে দাঁড়িয়ে নূর হোসেন দেখিয়ে দিয়েছিলেন, গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক দল নয়, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগেই বেঁচে থাকে। তার রক্তের দাগ মুছে যায়নি; বরং তা ইতিহাসে চিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে শহীদ ওসমান হাদি ছিলেন একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। তিনি কোনো সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নয়, বরং তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরের ব্যর্থতা, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে কথা বলছিলেন। দিনের আলোয় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে রিকশায় বসে থাকা একজন রাজনৈতিক কর্মী গুলিবিদ্ধ হন—এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকাশ্য ভেঙে পড়ার ঘোষণা।
নূর হোসেনের সময় রাষ্ট্র বলত, “আমরা স্বৈরাচার, তাই দমন করব।” হাদির সময় রাষ্ট্র বলে, “আমরা গণতান্ত্রিক, কিন্তু অপরাধ ঠেকাতে পারছি না।” এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে পার্থক্য থাকলেও ফলাফল এক—একজন নাগরিক নিহত।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্ন হলো, নূর হোসেনের আত্মত্যাগের ৩৮ বছর পরও কেন হাদির মতো একজন তরুণকে জীবন দিতে হয়? আমরা কি কেবল শাসকের ধরন বদলেছি, কিন্তু শাসনের চরিত্র বদলাইনি? আগে গুলি আসত পুলিশের লাঠিচার্জ থেকে, এখন আসে অদৃশ্য মোটরসাইকেল আর অজ্ঞাত সন্ত্রাসীর হাত থেকে।
নূর হোসেনের মৃত্যুর পর রাষ্ট্র বদলাতে বাধ্য হয়েছিল। আন্দোলন সফল হয়েছিল। কিন্তু হাদির মৃত্যু কি একই রকম পরিবর্তন আনবে, নাকি এটি আরেকটি নাম হবে শহীদের দীর্ঘ তালিকায়? প্রশ্নটি আজ আর আবেগের নয়, দায়িত্বের।
শহীদ নূর হোসেন আমাদের শিখিয়েছিলেন ভয় না পাওয়ার রাজনীতি। শহীদ ওসমান হাদি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আরেকটি সত্য—ভয়মুক্ত রাষ্ট্র কেবল স্লোগানে নয়, কার্যকর জবাবদিহিতায় গড়ে ওঠে। যদি হাদির হত্যার বিচার না হয়, তবে নূর হোসেনের আত্মত্যাগকেও আমরা অসম্মান করি।
ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—নূর হোসেনের রক্ত থেকে যে গণতন্ত্র জন্মেছিল, আমরা কি সেই গণতন্ত্রকে হাদির রক্তে হত্যা করেছি?
লেখক: এম.কে. রানা, গণমাধ্যমকর্মী
